এনআইডি সংশোধন: নাম, জন্মতারিখ ও ঠিকানা পরিবর্তনের নিয়ম
জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি সংশোধন: নাম, জন্মতারিখ ও ঠিকানা পরিবর্তনের নিয়ম, ক্যাটাগরি (ক, খ, গ, ঘ), সরকারি ফি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বিস্তারিত গাইডলাইন জেনে নিন।
বর্তমানে ব্যাংক হিসাব খোলা, ই-পাসপোর্ট (e-Passport) তৈরি, মোবাইল সিম নিবন্ধন থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি প্রায় প্রতিটি নাগরিক সেবায় জাতীয় পরিচয়পত্র (National Identity Card - NID) অপরিহার্য। ফলে কার্ডে থাকা তথ্যে সামান্য বানান ভুল বা গরমিল থাকলেও শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও অভিভাবকদের বড় ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। নাগরিকদের এই ভোগান্তি কমাতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (Election Commission) এনআইডি সংশোধন: নাম, জন্মতারিখ ও ঠিকানা পরিবর্তনের নিয়ম ও ক্যাটাগরিভিত্তিক যাচাই প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু যুগোপযোগী পরিবর্তন এনেছে। সঠিক প্রমাণপত্র বা ডকুমেন্ট (Supporting Documents) জমা দিয়ে এখন ঘরে বসেই অনলাইনে (NID Online Portal) কিংবা সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের মাধ্যমে ভুল তথ্য সংশোধন করে নেওয়া সম্ভব।
অনেকেই না জেনে ভুল ক্যাটাগরিতে আবেদন করেন কিংবা অসম্পূর্ণ কাগজপত্র আপলোড করেন, যার ফলে মাসের পর মাস আবেদন ঝুলে থাকে বা বাতিল (Rejected) হয়ে যায়। আবেদনের গুরুত্ব ও তথ্যের ধরন অনুযায়ী কোন সংশোধনে কী কাগজ লাগবে এবং কোন পর্যায়ের কর্মকর্তা সেটি নিষ্পত্তি করবেন, তা আগেভাগে জেনে নিলে দ্রুত স্মার্ট কার্ড (Smart Card) বা এনআইডির ভুল সংশোধন করা যায়।
এনআইডি সংশোধনের ক্যাটাগরি ও নিষ্পত্তির ধাপ
নির্বাচন কমিশন এনআইডি সংশোধনের (NID Correction) আবেদনগুলোকে তথ্যের গুরুত্ব ও পরিবর্তনের পরিধির ওপর ভিত্তি করে ক, ক-১, খ, খ-১, গ, গ-১ এবং ঘ—এই কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে। সংশোধনের আকার যত বড় হয়, যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়াও ততটাই সূক্ষ্ম হয়:
| ক্যাটাগরি | সংশোধনের ধরন ও পরিধি | নিষ্পত্তিকারী কর্মকর্তা |
|---|---|---|
| ক ও ক-১ ক্যাটাগরি (ছোট সংশোধন) | নামের বানানে আক্ষরিক ভুল, জন্মতারিখে সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত পরিবর্তন, পেশা, ধর্ম বা রক্তের গ্রুপ সংশোধন | উপজেলা বা থানা নির্বাচন কর্মকর্তা ও সহকারী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা |
| খ, খ-১ ও গ-১ ক্যাটাগরি (মাঝারি সংশোধন) | বানান পরিবর্তনের ফলে মূল নাম বদলে যাওয়া কিংবা জন্মতারিখে সর্বোচ্চ ৮ বছর পর্যন্ত ব্যবধান সংশোধন | জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা |
| গ ক্যাটাগরি (বড় সংশোধন) | নামের বড় পরিবর্তন, আংশিক জটিল সংশোধন ও আঞ্চলিক পর্যায়ের যাচাইযোগ্য আবেদন | আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা |
| ঘ ক্যাটাগরি (জটিল ও আমূল সংশোধন) | পুরো নাম বা পিতা-মাতা উভয়ের নাম পরিবর্তন, জন্মতারিখে ১০ বছর বা তার বেশি ব্যবধান এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদে বয়স সংশোধন | মহাপরিচালক (Director General), জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ (NID Wing) |
নাম, জন্মতারিখ ও ঠিকানা পরিবর্তনের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
এনআইডির ভুল তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে আপনার দাবির সপক্ষে গ্রহণযোগ্য দালিলিক প্রমাণ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। তথ্যের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা নিচে তুলে ধরা হলো:
- নিজের নাম ও জন্মতারিখ সংশোধন (Name & Date of Birth Correction): আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা ন্যূনতম জেএসসি (JSC), এসএসসি (SSC) বা সমমান হলে আবশ্যিকভাবে সেই পরীক্ষার সনদপত্র (Academic Certificate) এবং ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ (Online Birth Certificate) জমা দিতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসির নিচে হলে এনআইডি ইস্যুর আগের তারিখের সার্ভিস বুক, এমপিও কপি, ড্রাইভিং লাইসেন্স (Driving License), পাসপোর্ট বা কাবিননামা জমা দেওয়া যাবে। আর ডাকনাম বদলে সম্পূর্ণ নতুন নাম রাখতে চাইলে এসএসসি সনদের পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টের হলফনামা (Affidavit) ও জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনের কপি দিতে হবে।
- পিতা-মাতা ও স্বামী বা স্ত্রীর নাম সংশোধন (Parents & Spouse Name Change): পিতা বা মাতার নাম সংশোধনের জন্য আবেদনকারীর নিজের এসএসসি বা এইচএসসি সনদ (যেখানে অভিভাবকের নাম রয়েছে), জন্মসনদ এবং পিতা-মাতা ও ভাই-বোনের সত্যায়িত এনআইডি কপি প্রয়োজন হয়। অভিভাবক মারা গেলে নামের আগে ‘মৃত’ যুক্ত করতে মৃত্যু সনদ (Death Certificate) এবং জীবিত অভিভাবককে ভুলক্রমে ‘মৃত’ লেখা হলে তাঁর এনআইডি কপি দিতে হবে। বিয়ের পর স্বামী বা স্ত্রীর নাম যুক্ত করতে কাবিননামা (Nikahnama) ও তাঁর এনআইডি কপি এবং বিবাহবিচ্ছেদের পর নাম বাদ দিতে তালাকনামার সত্যায়িত কপি লাগবে।
- বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন (Present & Permanent Address Change): কেবল ঠিকানার বানান বা হোল্ডিং নম্বর সংশোধনের জন্য অনলাইনেই আবেদন করা যায়। তবে এক ভোটার এলাকা থেকে অন্য ভোটার এলাকায় নাম স্থানান্তরের জন্য নির্ধারিত ফরম-১৩ বা ফরম-১৪ পূরণ করে সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে সরাসরি আবেদন করতে হয়। উভয় ক্ষেত্রেই প্রমাণ হিসেবে জমির সত্যায়িত দলিল, সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ/গ্যাস/পানির বিল (Utility Bill), হোল্ডিং ট্যাক্স রসিদ, বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র অথবা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের প্রত্যয়নপত্র জমা দিতে হবে।
- রক্তের গ্রুপ সংশোধন (Blood Group Update): এনআইডিতে রক্তের গ্রুপ যুক্ত বা পরিবর্তন করতে অনুমোদিত হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিকেল রিপোর্ট (Medical Report) আপলোড করতে হয়।
নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক ৫টি জরুরি নির্দেশনা
নাগরিক সেবা সহজ করতে এবং জালিয়াতি রোধে নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম কার্যকর করেছে, যা প্রতিটি আবেদনকারীর জানা জরুরি:
- স্থানীয় পর্যায়েই জন্মতারিখ নিষ্পত্তি: জেএসসি, এসএসসি বা সমমানের সনদের ভিত্তিতে জন্মতারিখ সংশোধনের সাধারণ আবেদনগুলো এখন ‘ক’ ক্যাটাগরিতেই বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ঢাকায় না এসেই উপজেলা, থানা বা জেলা নির্বাচন অফিস থেকে দ্রুত এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
- মহাপরিচালক পর্যায়ে বিশেষ আবেদন: বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (BOU) সনদের ভিত্তিতে বয়স সংশোধন এবং একই সঙ্গে নিজের নাম, জন্মতারিখ ও পিতা-মাতার নাম আমূল পরিবর্তনের আবেদন কেবল এনআইডি উইংয়ের মহাপরিচালকের কার্যালয় থেকে নিষ্পত্তি করা হবে।
- একই তথ্য দ্বিতীয়বার সংশোধনের সুযোগ বন্ধ: নিজের নাম, পিতা-মাতার নাম কিংবা জন্মতারিখের মতো মৌলিক তথ্য একবার সংশোধন হয়ে গেলে একই ঘরে দ্বিতীয়বার পরিবর্তনের আর কোনো সুযোগ থাকে না। তাই প্রথমবার আবেদনের সময়ই শতভাগ নির্ভুল তথ্য দিতে হবে।
- সার্ভারে এসএসসি সনদ আপলোড বাধ্যতামূলক: মাধ্যমিক বা তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে এনআইডি সংশোধনের সময় এসএসসি বা সমমানের মূল সনদের স্ক্যান কপি নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে আপলোড করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
- প্রবাসীদের জন্য সহজীকরণের উদ্যোগ: প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেরই পুরোনো শিক্ষাগত সনদ সংগ্রহে থাকে না। তাই পাসপোর্ট ও ওয়ারিশ সনদের মতো দলিলের ভিত্তিতে প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধন সহজ করার বিষয়টি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের বিবেচনাধীন রয়েছে।
অনলাইনে এনআইডি সংশোধন আবেদন ও ফি পরিশোধের নিয়ম
ঘরে বসে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার দিয়ে অনলাইনে আবেদনের (NID Correction Online Application) জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন:
- পোর্টালে লগইন ও প্রোফাইল এডিট: প্রথমে নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল এনআইডি সেবা পোর্টালে নিবন্ধন করে লগইন করুন এবং ড্যাশবোর্ড থেকে ‘প্রোফাইল’ অপশনে গিয়ে ‘এডিট’ (Edit) বাটনে ক্লিক করে কাঙ্ক্ষিত তথ্যটি সংশোধন করুন।
- নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ: সংশোধনের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত ফি (সাধারণত প্রথমবার মৌলিক তথ্য সংশোধনে ভ্যাটসহ ২৩০ টাকা, কেবল অন্যান্য তথ্য সংশোধনে ১১৫ টাকা এবং উভয় ধরনের তথ্য একসঙ্গে সংশোধনে ৩৪৫ টাকা) বিকাশ (bKash), নগদ (Nagad), রকেট বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিশোধ করুন।
- ডকুমেন্ট আপলোড ও সাবমিট: ফি পরিশোধের পর আপনার দাবির সপক্ষে প্রয়োজনীয় মূল সনদগুলোর স্পষ্ট স্ক্যান কপি (নির্ধারিত সাইজের মধ্যে) আপলোড করে আবেদনটি চূড়ান্তভাবে সাবমিট করুন এবং প্রাপ্তিস্বীকারপত্রটি (Acknowledgement Slip) ডাউনলোড করে রাখুন।
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য নির্ভুল রাখা কেবল একটি দাপ্তরিক নিয়ম নয়, বরং ভবিষ্যতে উচ্চশিক্ষা, বিদেশযাত্রা, ব্যাংকিং ও সম্পত্তি রক্ষার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তাই আবেদনের আগে আপনার জন্মনিবন্ধন সনদ, শিক্ষাগত সনদ এবং পিতা-মাতার এনআইডিতে থাকা নামের বানান ও জন্মতারিখ হুবহু এক আছে কি না, তা ভালোভাবে মিলিয়ে নিন। এনআইডি সংশোধনের পুরো প্রক্রিয়াটি এখন ডিজিটাল ও স্বচ্ছ হওয়ায় কোনো দালাল বা তৃতীয় পক্ষের শরণাপন্ন না হয়ে সরাসরি অনলাইনে অথবা নিকটস্থ উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করে নিরাপদে আপনার কার্ডের তথ্য হালনাগাদ করে নিন।