জিরো রিটার্ন দাখিল ২০২৬-২৭: ঘরে বসে অনলাইনে ১০ মিনিটে করুন নিজেই

২০২৬-২৭ করবর্ষে টিআইএনধারীদের জন্য ঘরে বসে অনলাইনে জিরো রিটার্ন দাখিলের ধাপে ধাপে সহজ গাইড। জানুন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, e-Return পোর্টালে সাবমিট করার নিয়ম ও সাধারণ ভুলগুলো এড়ানোর উপায়।

Oct 7, 2026 - 21:13
 0  5
জিরো রিটার্ন দাখিল ২০২৬-২৭: ঘরে বসে অনলাইনে ১০ মিনিটে করুন নিজেই

আয় নেই—তাই রিটার্নও দেওয়া লাগবে না। অনেকেই এই ভুল ধারণা পোষণ করেন, অথচ বাস্তবতা একদম ভিন্ন। বাংলাদেশে যার নামে টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট রয়েছে, তাকেই প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন দাখিল করতে হয়—আয় থাকুক বা না থাকুক। আর আয় না থাকলে যে রিটার্নটি দাখিল করা হয়, সেটিই জনপ্রিয়ভাবে পরিচিত জিরো রিটার্ন নামে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ইতিমধ্যে ২০২৬-২৭ করবর্ষের জন্য অনলাইনে আয়কর রিটার্ন গ্রহণ শুরু করেছে। ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য এবারও e-Return বাধ্যতামূলক, অর্থাৎ সরাসরি ট্যাক্স অফিসে গিয়ে কাগজে রিটার্ন দেওয়ার সুযোগ সবার জন্য নেই। সুখবর হলো, স্মার্টফোন বা কম্পিউটার থাকলেই বাড়িতে বসে মাত্র কয়েক মিনিটে জিরো রিটার্ন দাখিল করা সম্ভব—কোনো করকর্তা বা দালালের সহায়তা ছাড়াই।

এই প্রতিবেদনে ধাপে ধাপে জানানো হয়েছে কীভাবে নিজেই জিরো রিটার্ন সাবমিট করবেন, কী কী কাগজপত্র আগে থেকে গুছিয়ে রাখবেন এবং কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন।

জিরো রিটার্ন আসলে কী?

জিরো রিটার্ন বলতে এমন একটি আয়কর রিটার্নকে বোঝায়, যেখানে করদাতার আয়, সম্পদ ও দায়ের হিসাব দেওয়ার পর প্রদেয় করের পরিমাণ শূন্য হয়। অর্থাৎ আপনার আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলে বা কোনো আয়ই না থাকলেও টিআইএনধারী হিসেবে আপনাকে এই রিটার্ন দাখিল করতে হবে।

মনে রাখবেন, আইনের ভাষায় আলাদা করে ‘জিরো রিটার্ন’ নামে কোনো ফরম নেই। এটি সাধারণ রিটার্নই—তবে করের পরিমাণ শূন্য হওয়ায় মানুষজন এভাবেই ডাকে। তাই এটি দাখিলের নিয়মও সাধারণ রিটার্নের মতোই।

কাদের জিরো রিটার্ন দাখিল করতে হবে?

যাদের নামে ১২ ডিজিটের টিআইএন সার্টিফিকেট রয়েছে, তাদের সবার জন্যই বাৎসরিক রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক। এতে অবৈতনিক প্রশিক্ষণার্থী, নতুন চাকরিজীবী, ফ্রিল্যান্সার, শিক্ষার্থী বা যেকোনো ব্যক্তি পড়তে পারেন—যার আয় এখনো করযোগ্য সীমায় পৌঁছায়নি।

অনেকেই ব্যাংক হিসাব খোলা, চাকরির প্রয়োজনে বা বিনিয়োগের জন্য টিআইএন করেছিলেন, কিন্তু আয় না থাকায় রিটার্ন দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব দেন না। এতে পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। জিরো রিটার্ন দাখিল করলে আপনার করদাতা রেকর্ড নিয়মিত থাকে, ভবিষ্যতে ঋণ, ভিসা বা অন্য কোনো আর্থিক কাজে সুবিধা পাবেন।

রিটার্ন দেওয়ার আগে যা প্রস্তুত রাখবেন

পোর্টালে ঢোকার আগেই নিচের বিষয়গুলো গুছিয়ে নিলে কাজ হবে দ্রুত ও ঝামেলামুক্ত:

  • ১২ ডিজিটের টিআইএন নম্বর
  • জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)
  • এনআইডির সঙ্গে বায়োমেট্রিকভাবে যুক্ত মোবাইল নম্বর (নিবন্ধন ও যাচাইকরণের জন্য জরুরি)
  • ব্যাংক হিসাবের স্টেটমেন্ট বা জেরের তথ্য
  • চাকরিজীবী হলে বেতনের সনদ বা পে-স্লিপ
  • জমি, গাড়ি, সঞ্চয়পত্র বা ঋণ থাকলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র
  • সারা বছরের জীবনযাত্রার মোটামুটি খরচের হিসাব

জিরো রিটার্ন হলেও ব্যাংক হিসাব বা জীবনযাত্রার খরচের তথ্য পুরোপুরি ফাঁকা রাখা ঠিক নয়। আপনার নামে ব্যাংক হিসাব থাকলে সেটির তথ্য সত্যভাবে উল্লেখ করতে হবে।

অনলাইনে জিরো রিটার্ন দাখিলের ৭টি ধাপ

ধাপ ১: ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন। এনবিআর-এর অফিসিয়াল ই-রিটার্ন পোর্টাল etaxnbr.gov.bd খুলুন। আগে থেকে নিবন্ধন করা থাকলে টিআইএন ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করুন। নতুন করদাতা হলে টিআইএন, এনআইডি ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট খুলে নিন।

ধাপ ২: রিটার্ন সাবমিশন অপশনে যান। লগইনের পর ড্যাশবোর্ড থেকে “রিটার্ন সাবমিশন” অপশন বেছে নিন। এখানে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, আয়ের খাত, সম্পদ ও দায়ের ঘরগুলো ধাপে ধাপে পূরণ করতে হবে।

ধাপ ৩: আয়ের তথ্য দিন। চাকরি, ব্যবসা, বাড়ি ভাড়া, ব্যাংক সুদ—যেকোনো উৎস থেকে সামান্য আয়ও থাকলে সংশ্লিষ্ট ঘরে সত্যিকারের তথ্য বসান। কোনো আয় না থাকলে সংশ্লিষ্ট ঘর শূন্য রাখুন।

ধাপ ৪: সম্পদ, দায় ও ব্যয়ের হিসাব দিন। ব্যাংক হিসাবের জের, জমি, গাড়ি, স্বর্ণালংকার, ঋণ এবং বছরের জীবনযাত্রার খরচ—এই অংশে এসব তথ্য যায়। জিরো রিটার্নেও এই অংশটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সম্পদ ও খরচের হিসাব মিলিয়েই সিস্টেম আপনার রিটার্ন যাচাই করে।

ধাপ ৫: কর হিসাব মিলিয়ে নিন। সব তথ্য দেওয়া শেষ হলে সিস্টেম নিজেই প্রদেয় করের হিসাব করবে। আপনার আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে প্রদেয় কর দেখাবে শূন্য—অর্থাৎ এটিই আপনার জিরো রিটার্ন।

ধাপ ৬: রিটার্ন ভিউ দেখে যাচাই করুন। সাবমিটের আগে অবশ্যই “রিটার্ন ভিউ” অপশনে পুরো রিটার্নটি একবার দেখে নিন। নাম, টিআইএন, ঠিকানা ও সংখ্যাগুলোতে ভুল আছে কি না, তা নিশ্চিত হোন।

ধাপ ৭: সাবমিট করে স্লিপ সংরক্ষণ করুন। সব ঠিক থাকলে সাবমিট বাটনে ক্লিক করুন। সাবমিটের সঙ্গে সঙ্গেই প্রাপ্তিস্বীকার স্লিপ (Acknowledgement Slip) পেয়ে যাবেন এবং ট্যাক্স সার্টিফিকেটও তৈরি হয়ে যাবে। দুটোই ডাউনলোড করে নিরাপদে সংরক্ষণ করুন—ভবিষ্যতে এগুলোই রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে।

সাধারণ ভুলগুলো যেভাবে এড়াবেন

অনেক করদাতা তাড়াহুড়ায় কিছু সাধারণ ভুল করে ফেলেন, যা পরে ঝামেলার কারণ হয়। এনআইডির সঙ্গে যুক্ত নয় এমন মোবাইল নম্বর দিয়ে নিবন্ধনের চেষ্টা করলে যাচাইকরণ আটকে যায়। আবার ব্যাংক হিসাব থাকা সত্ত্বেও তা গোপন করলে সম্পদের হিসাবে অসঙ্গতি তৈরি হয়। সাবমিটের আগে রিটার্ন ভিউ না দেখা, এবং সাবমিটের পর স্লিপ সংরক্ষণ না করা—এই দুটি ভুল সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

মনে রাখবেন, রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা এনবিআর প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জানায় এবং মাঝে মধ্যে তা বর্ধিতও করা হয়। তাই সর্বশেষ সময়সীমা এনবিআর-এর ওয়েবসাইট বা সরকারি নোটিশ থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন। সময়মতো রিটার্ন দাখিল করা সবসময়ই নিরাপদ।

সমাপনী

জিরো রিটার্ন দাখিলকে আর ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। এনবিআর-এর ই-রিটার্ন ব্যবস্থা এখন এতটাই সহজ হয়েছে যে বেসিক ইন্টারনেট জ্ঞান থাকলেই যে কেউ নিজে এই কাজ করতে পারেন। সঠিক কাগজপত্র গুছিয়ে নিন, ধাপে ধাপে তথ্য দিন, সাবমিটের আগে যাচাই করুন এবং স্লিপ সংরক্ষণ করুন—ব্যাস, আপনার এই বছরের করদায়িত্ব শেষ। নিয়মিত রিটার্ন দাখিল শুধু আইন মেনে চলা নয়, এটি আপনার আর্থিক পরিচয়ও গড়ে তোলে। তাই আর দেরি না করে আজই পোর্টালে ঢুকে রিটার্নটি সেরে ফেলুন।

Shakil হ্যালো "ট্রিকবিডি" বাসী আমি শাকিল আহাম্মেদ। দীর্ঘদিন থেকে অনলাইনে লেখালেখির পেশায় যুক্ত আছি। TrickBD আমার নিজের হাতে তৈরি করা একটি ওয়েবসাইট। এখানে আমি প্রতিনিয়ত ব্লগিং, ইউটিউবিং ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস এন্ড ট্রিক্স রিলেটেড আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।