জমির দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে? জেনে নিন সরকারি নিয়ম ও করণীয়
জমির দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে তা নিয়ে চিন্তিত? জেনে নিন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বালাম বই ও সূচিবহি তল্লাশি, সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ এবং অনলাইনে জমির দলিল যাচাই (Land Deed Verification) করার সঠিক সরকারি নিয়ম।
জমি বা ফ্ল্যাট কেনার পর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হলো মালিকানার আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অনেকেই মনে করেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলে স্বাক্ষর করা এবং দলিল জমা দেওয়ার রসিদ (Receipt) হাতে পাওয়া মানেই রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শেষ। বাস্তবে দলিল জমা দেওয়া আর সরকারি রেকর্ডে নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়া এক বিষয় নয়। তাই প্রতারণা ও আইনি জটিলতা এড়াতে দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে, তা প্রতিটি জমির ক্রেতা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জেনে রাখা জরুরি।
একটি দলিল সঠিকভাবে নিবন্ধিত (Registered Deed) হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে মূল দলিলের শেষ পাতার তথ্য পরীক্ষা, সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের (Sub-Registry Office) বালাম বই ও সূচিবহি তল্লাশি এবং প্রয়োজনে সার্টিফায়েড কপি (Certified Copy) বা জাবেদা নকল উত্তোলন করে মূল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হয়। নিবন্ধন অধিদপ্তরের (Directorate of Registration) নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে খুব সহজেই এই যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।
দলিল রেজিস্ট্রি যাচাই কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার একটি বড় অংশই তৈরি হয় জমিজমা ও ভুয়া দলিলের বিরোধ থেকে। অসাধু চক্র অনেক সময় ভুয়া দলিল নম্বর, জাল সিলমোহর এবং নকল রসিদ তৈরি করে সাধারণ ক্রেতাদের প্রতারিত করে।
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল উপস্থাপনের পর সেটি সরকারি বালাম বইয়ে (Balam Book) লিপিবদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত নিবন্ধন সম্পন্ন হয় না। ফলে কেবল হাতের কাগজ বা রসিদের ওপর ভরসা না করে সরকারি রেজিস্টার বহির সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা অপরিহার্য।
দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে: ৫টি কার্যকর ধাপ
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আপনার জমির দলিলটি আসলেই রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না, তা ধাপে ধাপে যাচাই করার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নিচে তুলে ধরা হলো।
১. মূল দলিলের শেষ পাতার নিবন্ধন তথ্য পরীক্ষা (Endorsement Check)
আপনার হাতে যদি মূল দলিলটি থাকে, তবে সবার আগে সেটির শেষ পাতার উল্টো পিঠ ভালোভাবে লক্ষ্য করুন। দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হলে সেখানে সরকারি নিবন্ধনের বিস্তারিত তথ্য বা এনডোর্সমেন্ট (Endorsement) লেখা থাকে।
এই অংশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে দলিলটি কোন সালের কত নম্বর বালাম বইয়ে (Volume/Balam Book) নকল করা হয়েছে এবং ওই বইয়ের কত নম্বর পৃষ্ঠা থেকে কত নম্বর পৃষ্ঠা পর্যন্ত দলিলের বিবরণী সংরক্ষিত আছে। পাশাপাশি সেখানে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর, তারিখ ও সরকারি সিলমোহর থাকে। তবে মনে রাখবেন, শুধু কাগজে সিল-স্বাক্ষর থাকলেই সেটি শতভাগ আসল ধরে নেওয়া যাবে না; এই তথ্যগুলো সূত্র হিসেবে ব্যবহার করে অফিসের মূল রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।
২. দলিল নম্বর ও সাল দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেকর্ড যাচাই
দলিলের নম্বর, রেজিস্ট্রেশনের বছর (Year of Registration) এবং কোন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিলটি সম্পাদিত হয়েছে—এই তিনটি তথ্য জানা থাকলে যাচাইয়ের কাজটি সবচেয়ে সহজ হয়ে যায়।
সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে দলিলের নম্বর ও সাল উল্লেখ করে রেকর্ড রুম বা তল্লাশি শাখায় খোঁজ নিতে হবে। অফিসের সংরক্ষিত বালাম বই এবং সূচিবহিতে (Index Book) আপনার দলিলের এন্ট্রি আছে কি না, তা পরীক্ষা করলেই নিবন্ধনের প্রকৃত অবস্থা জানা যাবে। যাচাইয়ের সুবিধার্থে দাতা ও গ্রহীতার নাম, জমির মৌজা, খতিয়ান এবং দাগ নম্বরের তথ্যও সাথে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ।
৩. দলিল নম্বর জানা না থাকলে সূচিবহি তল্লাশি (Index Book Search)
অনেক সময় পুরোনো দলিল হারিয়ে যায়, পাতা নষ্ট হয়ে লেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে অথবা দলিলের সঠিক নম্বর মনে থাকে না। এমন পরিস্থিতিতেও দলিল যাচাই করার সরকারি উপায় রয়েছে।
দলিল নম্বর না থাকলে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সূচিবহি তল্লাশি (Index Search) করার জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। প্রতিটি রেজিস্ট্রি অফিসে দাতা-গ্রহীতার নাম এবং মৌজার নাম অনুযায়ী আলাদা সূচিবহি (সূচি-১ ও সূচি-২) সংরক্ষিত থাকে।
আবেদনের সময় নিচের তথ্যগুলো প্রদান করতে হয়:
- দাতা ও গ্রহীতার নাম: জমি যিনি বিক্রি বা হস্তান্তর করেছেন (Seller/Donor) এবং যিনি গ্রহণ করেছেন (Buyer/Recipient) তাদের পূর্ণ নাম ও পিতার নাম।
- জমির অবস্থান: সংশ্লিষ্ট মৌজার নাম, জেএল (JL) নম্বর, খতিয়ান ও দাগ নম্বর।
- সম্ভাব্য সময়কাল: আনুমানিক কোন সালে বা কোন সময়ের মধ্যে দলিলটি রেজিস্ট্রি হয়েছিল তার ধারণা।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, সূচিপত্র তল্লাশির জন্য সরকারি ফি অত্যন্ত সীমিত—প্রথম বছরের তল্লাশির জন্য ২০ টাকা এবং একাধিক বছরের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত প্রতি বছরের জন্য ১৫ টাকা (একটি নাম বা সম্পত্তির বিবরণ তল্লাশির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকা) এবং রেজিস্টার বহি পরিদর্শনের জন্য নির্দিষ্ট পরিদর্শন ফি (১০ টাকা) প্রযোজ্য হয়।
৪. সার্টিফায়েড কপি বা জাবেদা নকল তুলে তথ্য মেলানো (Certified Copy Verification)
দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না তা শতভাগ নিশ্চিত হওয়ার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও আইনি পদ্ধতি হলো সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস থেকে ওই দলিলের একটি সার্টিফায়েড কপি (Certified Copy of Deed) বা প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করা।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া ‘নকলের আবেদন ফরম’ পূরণ করে এবং নির্ধারিত সরকারি ফি জমা দিয়ে সার্টিফায়েড কপির জন্য আবেদন করা যায়। অফিস থেকে নকল কপি হাতে পাওয়ার পর আপনার কাছে থাকা মূল দলিল বা ফটোকপির সঙ্গে নিচের তথ্যগুলো অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে দেখুন:
- দাতা ও গ্রহীতার পরিচয়: উভয় পক্ষের নাম, পিতা/মাতার নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও ঠিকানা।
- রেজিস্ট্রেশন ও বালাম তথ্য: দলিল নম্বর, নিবন্ধনের তারিখ, বালাম নম্বর ও পৃষ্ঠা নম্বর।
- জমির তফশিল (Schedule of Land): মৌজার নাম, সিএস/এসএ/আরএস/বিএস খতিয়ান নম্বর এবং দাগ নম্বর।
- জমির পরিমাণ ও চৌহদ্দি: দলিলে উল্লেখিত জমির মোট পরিমাণ এবং চারপাশের সীমানার (Boundary) বিবরণ।
যদি দেখা যায় অফিস থেকে তোলা সার্টিফায়েড কপির তথ্যের সঙ্গে আপনার হাতের দলিলের তথ্যে গরমিল রয়েছে (যেমন—দাগ নম্বর ভিন্ন বা জমির পরিমাণ বাড়িয়ে লেখা), তবে বুঝতে হবে মূল কাগজে কোনো জালিয়াতি বা ঘষামাজা করা হয়েছে। এমন ক্ষেত্রে দ্রুত সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের পরামর্শ এবং একজন অভিজ্ঞ দেওয়ানি আইনজীবীর সহায়তা নিতে হবে।
৫. কেবল রেজিস্ট্রির রসিদ থাকলে দলিলের বর্তমান অবস্থা যাচাই
নতুন জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে দলিল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা দেওয়ার পর ক্রেতাকে একটি সরকারি রসিদ (Original Receipt) দেওয়া হয়। পরবর্তীতে মূল দলিল ফেরত নেওয়ার সময় এই রসিদটি জমা দিতে হয়। কিন্তু অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা কাজ করে যে, হাতে রসিদ থাকা মানেই দলিল রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়ে গেছে।
সরকারি বিধি মোতাবেক, দলিল রেজিস্ট্রির জন্য গ্রহণ করা (Presentation of Deed) এবং চূড়ান্ত নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ হওয়া দুটি আলাদা ধাপ। দলিল গৃহীত হওয়ার পর সেটি বালাম বইয়ে নকল করা, সূচিবহিতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সাব-রেজিস্ট্রারের চূড়ান্ত স্বাক্ষর সম্পন্ন হতে অফিসভেদে নির্দিষ্ট সময় লাগে। তাই রসিদ হাতে থাকলে বসে না থেকে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করে জেনে নিন আপনার দলিলটি বালাম বইয়ে নকল হয়ে চূড়ান্ত রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়েছে কি না এবং মূল দলিল কবে ফেরত দেওয়া হবে।
একনজরে দলিল রেজিস্ট্রি যাচাইয়ের ধাপ ও প্রয়োজনীয় তথ্য
পাঠকদের সুবিধার্থে কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে দলিল যাচাই করবেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত তুলনামূলক ছক নিচে দেওয়া হলো:
| আপনার কাছে কী তথ্য আছে? | যাচাই করার সরকারি পদ্ধতি | কোথায় ও কীভাবে আবেদন করবেন? | যাচাইয়ের মূল লক্ষ্য |
|---|---|---|---|
| মূল দলিল হাতে আছে | শেষ পাতার উল্টো পিঠের বালাম ও পৃষ্ঠা নম্বর মিলিয়ে রেকর্ড যাচাই | সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড রুমে পরিদর্শন আবেদন | দলিলের সিল-স্বাক্ষর ও বালাম এন্ট্রি আসল কি না নিশ্চিত হওয়া |
| দলিল নম্বর ও সাল জানা আছে | সরাসরি বালাম বহি ও রেজিস্টার পরিদর্শন এবং নকল উত্তোলন | নকলের আবেদন ফরম পূরণ করে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমা | সরকারি রেকর্ডে দলিলের হুবহু অস্তিত্ব ও তফশিল যাচাই করা |
| দলিল নম্বর জানা নেই বা দলিল হারিয়েছে | দাতা-গ্রহীতার নাম ও মৌজা দিয়ে সূচিবহি তল্লাশি (Index Search) | ‘তল্লাশ ও পরিদর্শন ফরম’ পূরণ করে নির্ধারিত ফি জমা | পুরোনো বা হারানো দলিলের নম্বর, সাল ও বালাম বই খুঁজে বের করা |
| শুধু দলিল জমার রসিদ আছে | রসিদ নম্বর দিয়ে বালাম লেখার অগ্রগতি (Status) অনুসন্ধান | সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ডেলিভারি/নকল শাখায় যোগাযোগ | দলিলটি চূড়ান্তভাবে রেজিস্ট্রি ও বালামভুক্ত হয়েছে কি না তা জানা |
দলিল যাচাই করতে কী কী তথ্য ও কাগজপত্র সাথে রাখবেন?
সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে তল্লাশি বা যাচাইয়ের কাজে যাওয়ার আগে নিচের তথ্যগুলো একটি নোটবুকে গুছিয়ে নিলে অল্প সময়েই সঠিক রেকর্ড খুঁজে পাওয়া সম্ভব:
- দলিলের মৌলিক তথ্য: দলিল নম্বর (Deed Number) এবং রেজিস্ট্রেশনের সাল (যদি জানা থাকে)।
- অফিসের নাম: যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের অধীনে জমিটি অবস্থিত বা দলিলটি জমা দেওয়া হয়েছিল।
- জমির তফশিল: মৌজার নাম, জেএল নম্বর, খতিয়ান নম্বর (Khatian No) এবং দাগ নম্বর (Plot/Dag No)।
- পক্ষগণের নাম: বিক্রেতা বা দাতা এবং ক্রেতা বা গ্রহীতার পূর্ণ নাম ও পিতার নাম।
- প্রমাণপত্র: মূল দলিলের ফটোকপি, বালাম ও পৃষ্ঠা নম্বর কিংবা দলিল জমা দেওয়ার সরকারি রসিদ।
অনলাইনে কি দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করা যায়? (Online Land Deed Verification)
প্রযুক্তির এই যুগে অনেকেই গুগলে সার্চ করেন কীভাবে ঘরে বসে অনলাইনে দলিল নম্বর দিয়ে দলিল যাচাই করা যায়। এ বিষয়ে সঠিক ও বাস্তব তথ্য জানা অত্যন্ত জরুরি, যাতে কেউ ভুয়া ওয়েবসাইট বা প্রতারকের পাল্লায় না পড়েন।
বর্তমানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে অনলাইনে ই-পর্চা বা খতিয়ান যাচাই, অনলাইন নামজারি এবং ভূমি উন্নয়ন কর দেওয়ার ব্যবস্থা চালু রয়েছে। পাশাপাশি নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীনে ‘ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্প’ (e-Registration) এবং পুরোনো দলিল ডিজিটালাইজেশনের কাজ ধাপে ধাপে এগিয়ে চলছে।
তবে এখন পর্যন্ত সারা দেশের সব সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সকল নিবন্ধিত দলিলের অবস্থা সরাসরি দলিল নম্বর দিয়ে অনলাইনে চেক করার মতো কোনো সর্বজনীন ও উন্মুক্ত সরকারি ডাটাবেজ সবার জন্য চালু হয়নি। তাই কেউ যদি দাবি করে যে যেকোনো দলিল নম্বর দিলেই অনলাইনে মুহূর্তের মধ্যে আসল দলিল ডাউনলোড করা যাবে, তবে সেটি বিভ্রান্তিকর। দলিল রেজিস্ট্রি যাচাইয়ের জন্য এখনো সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড তল্লাশি এবং সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করাই একমাত্র শতভাগ নির্ভরযোগ্য ও আইনি পদ্ধতি। অবশ্য তল্লাশি ও নকলের আবেদনের সরকারি ফরমগুলো নিবন্ধন অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে ঘরে বসেই ডাউনলোড করে নেওয়া যায়।
দলিল রেজিস্ট্রি সঠিক থাকলেই কি জমির মালিকানা শতভাগ নিরাপদ?
একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে মনে রাখা দরকার—দলিল রেজিস্ট্রি যাচাই করা এবং জমির মালিকানা নিষ্কণ্টক হওয়া এক কথা নয়। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো দলিল বৈধভাবে রেজিস্ট্রি হওয়ার অর্থ হলো লেনদেনের চুক্তিটি সরকারি নিয়ম মেনে নিবন্ধিত হয়েছে। কিন্তু বিক্রেতার নিজেরই যদি ওই জমিতে বৈধ মালিকানা না থাকে, তবে শুধু রেজিস্ট্রি হওয়া দলিল দিয়ে জমির মালিকানা টেকানো কঠিন হতে পারে।
তাই জমি কেনার আগে বা মালিকানা নিশ্চিত করতে দলিল রেজিস্ট্রির পাশাপাশি নিচের বিষয়গুলোও যাচাই (Cross-check) করতে হবে:
- মালিকানার ধারাবাহিকতা (Chain of Ownership): বিক্রেতা জমিটি কীভাবে পেলেন, তার আগের বায়া দলিল (Baya Deed) বা পিট দলিলগুলো সঠিক আছে কি না তা অন্তত ২৫ বছরের রেকর্ড ধরে যাচাই করা।
- খতিয়ান ও নামজারি (Khatian & Mutation): সর্বশেষ জরিপের খতিয়ান (RS/BS/City Jorip) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসি ল্যান্ড অফিসে দাতার নামে ই-মিউটেশন বা নামজারি (Mutation) ও হালনাগাদ খাজনার দাখিলা আছে কি না তা দেখা।
- জমির বাস্তব দখল (Physical Possession): সরেজমিনে জমিতে গিয়ে দেখা যে জমিটি বর্তমানে কার দখলে রয়েছে এবং একই জমি আগে অন্য কারো কাছে বিক্রি বা ব্যাংকে মর্টগেজ (Mortgage) রাখা হয়েছে কি না।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর (FAQ)
১. দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না তা কি ঘরে বসে অনলাইনে দেখা সম্ভব?
সারা দেশের সব নিবন্ধিত দলিল নম্বর দিয়ে সরাসরি অনলাইনে যাচাই করার সর্বজনীন সরকারি পোর্টাল এখনো সবার জন্য উন্মুক্ত হয়নি। খতিয়ান ও নামজারি অনলাইনে দেখা গেলেও দলিলের রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে রেকর্ড তল্লাশি করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
২. দলিলের রসিদ হাতে থাকলে কি রেজিস্ট্রি শেষ হয়েছে ধরা যায়?
না। রসিদ কেবল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল জমা দেওয়ার প্রমাণ বহন করে। দলিলটি সরকারি বালাম বইয়ে নকল হয়ে সাব-রেজিস্ট্রারের চূড়ান্ত স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত নিবন্ধন প্রক্রিয়া পূর্ণাঙ্গ হয় না।
৩. দলিলের নম্বর হারিয়ে গেলে কীভাবে দলিল খুঁজে বের করব?
দলিল নম্বর মনে না থাকলে জমির মৌজার নাম, দাতা ও গ্রহীতার নাম এবং আনুমানিক সাল উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ‘সূচিবহি তল্লাশি’র (Index Book Search) আবেদন করতে হবে। সেখান থেকেই দলিল নম্বর ও বালাম বইয়ের তথ্য পাওয়া যাবে।
৪. দলিলের সার্টিফায়েড নকল বা জাবেদা নকল কোথা থেকে তুলতে হয়?
জমিটি যে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত হয়েছে, সেই অফিসে নির্ধারিত ফরমে আবেদন এবং সরকারি ফি জমা দিয়ে সার্টিফায়েড নকল (Certified Copy) সংগ্রহ করতে হয়।
৫. খতিয়ানে নাম থাকলেই কি দলিল রেজিস্ট্রি করার প্রয়োজন নেই?
খতিয়ান বা নামজারি এবং দলিল নিবন্ধন সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি আইনি প্রক্রিয়া। কেনাবেচা বা দান সূত্রে জমির মালিকানা হস্তান্তর হতে হলে নিবন্ধন আইন অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল রেজিস্ট্রি হওয়া বাধ্যতামূলক; এবং রেজিস্ট্রিকৃত দলিলের ভিত্তিতেই পরবর্তীতে নামজারি খতিয়ান তৈরি হয়।
শেষ কথা
জমি বা স্থাবর সম্পত্তি মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়ের ফসল। সামান্য অসচেতনতা বা যাচাইয়ের অভাবে যেন বড় কোনো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে না হয়, সেজন্য দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছে কি না যাচাই করবেন যেভাবে তার প্রতিটি ধাপ জানা থাকা জরুরি। মূল দলিলের শেষ পাতার বালাম ও পৃষ্ঠা নম্বর পরীক্ষা করা, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সূচিবহি তল্লাশি করা এবং সার্টিফায়েড নকল তুলে তথ্য মিলিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে খুব সহজেই দলিলের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়। যেকোনো জমি কেনার আগে তাড়াহুড়ো না করে রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড এবং ভূমি অফিসের খতিয়ান—দুটিই সঠিকভাবে যাচাই করে তবেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিন।