ক্যান্সার ও কিডনিসহ ৭টি জটিল রোগে সরকারি সহায়তা ১ লাখ টাকা: কারা পাবেন এবং কীভাবে আবেদন করবেন?

ক্যান্সার ও কিডনিসহ ৭টি জটিল রোগে সরকারি সহায়তা হিসেবে এককালীন ১ লাখ টাকা দিচ্ছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে অনলাইন আবেদনের নিয়ম, যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের বিস্তারিত গাইড জানুন।

Oct 25, 2026 - 08:02
 0  8
ক্যান্সার ও কিডনিসহ ৭টি জটিল রোগে সরকারি সহায়তা ১ লাখ টাকা: কারা পাবেন এবং কীভাবে আবেদন করবেন?

দেশে দুরারোগ্য ও ব্যয়বহুল ব্যাধিতে আক্রান্ত অসচ্ছল মানুষদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে বড় সুখবর দিয়েছে সরকার। এখন থেকে ক্যান্সার ও কিডনিসহ ৭টি জটিল রোগে সরকারি সহায়তা হিসেবে নির্বাচিত প্রত্যেক রোগীকে এককালীন ১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হচ্ছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (Ministry of Social Welfare) অধীন সমাজসেবা অধিদপ্তর (Department of Social Services - DSS) ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরে সারা দেশের মোট ৬৫,০০০ জন দরিদ্র ও অসহায় রোগীকে এই বিশেষ চিকিৎসা অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আগে এই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ৬টি জটিল রোগের জন্য এককালীন ৫০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হতো। তবে বর্তমান চিকিৎসা ব্যয় ও ওষুধের মূল্যের কথা বিবেচনা করে ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে অনুদানের পরিমাণ দ্বিগুণ করে ১ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং তালিকায় নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সার (Leukemia)। এই অর্থবছরে প্রকল্পটির আওতায় সরকারি বাজেটে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৫০ কোটি টাকা।

আমাদের চারপাশে এমন অনেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক বা সাধারণ পরিবার রয়েছেন, যাঁরা পরিবারের কোনো সদস্যের ক্যান্সার, কিডনি বিকল বা হৃদরোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন। সঠিক তথ্যের অভাবে অনেকেই সরকারি এই মানবিক সহায়তার সুযোগ নিতে পারেন না। আজকের এই বিস্তারিত গাইডে আমরা জানব কোন ৭টি রোগে এই অনুদান মিলবে, কারা আবেদন করতে পারবেন, রোগভেদে কী কী মেডিকেল টেস্ট রিপোর্ট লাগবে এবং ঘরে বসেই কীভাবে নির্ভুলভাবে অনলাইনে আবেদন (Online Application Process) সম্পন্ন করবেন।

ক্যান্সার ও কিডনিসহ ৭টি জটিল রোগে সরকারি সহায়তা: একনজরে মূল তথ্য

পাঠকদের দ্রুত বোঝার সুবিধার্থে সরকারি এই চিকিৎসা অনুদান কর্মসূচির (Government Medical Financial Assistance Program) প্রধান তথ্যগুলো নিচের ছকে তুলে ধরা হলো:

তথ্যের বিষয় বিস্তারিত বিবরণ
কর্মসূচির নাম ক্যান্সার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, প্যারালাইসিস, হৃদরোগ, লিউকেমিয়া এবং থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি
বাস্তবায়নকারী সংস্থা সমাজসেবা অধিদপ্তর (Department of Social Services), সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়
অনুদানের পরিমাণ প্রতিজন রোগীর জন্য এককালীন ১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা
২০২৬–২৭ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা মোট ৬৫,০০০ জন রোগী (মোট বাজেট বরাদ্দ ৬৫০ কোটি টাকা)
আওতাভুক্ত রোগের সংখ্যা ৭টি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি রোগ
আবেদনের মাধ্যম অনলাইন পোর্টাল (Online Portal) ও স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ে হার্ডকপি জমাদান
আবেদন ফি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (কোনো সরকারি ফি নেই)
অনুদান প্রাপ্তির সীমা একই অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১ বার এবং জীবদ্দশায় সর্বোচ্চ ৩ বার

কোন ৭টি জটিল রোগে সরকারি ১ লাখ টাকা অনুদান পাওয়া যাবে?

সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সব ধরনের অসুস্থতার জন্য এই তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হয় না। সুনির্দিষ্ট ৭টি দীর্ঘমেয়াদি ও জীবনঘাতী রোগের (Critical Illnesses) ব্যয়বহুল চিকিৎসার জন্যই কেবল এই আর্থিক অনুদান বরাদ্দ করা হয়েছে। রোগগুলো এবং এর আওতাভুক্ত চিকিৎসার ধরন নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ক্যান্সার (Cancer)

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (Oncologist) দ্বারা নির্ণীত শরীরের যেকোনো ধরনের ম্যালিগন্যান্ট টিউমার বা ক্যান্সার এই সহায়তার আওতাভুক্ত। বিশেষ করে যেসব রোগীর কেমোথেরাপি (Chemotherapy), রেডিওথেরাপি (Radiotherapy), ক্যান্সার সার্জারি কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে, তাঁরা আবেদন করতে পারবেন।

২. কিডনি রোগ (Chronic Kidney Disease - CKD)

দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ বা ক্রনিক রেনাল ফেইলিউরে আক্রান্ত রোগী, যাঁদের বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত ডায়ালাইসিস (Hemodialysis অথবা Peritoneal Dialysis) করতে হচ্ছে কিংবা কিডনি প্রতিস্থাপন (Kidney Transplant) করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে অথবা ইতোমধ্যে কিডনি প্রতিস্থাপিত হয়েছে—তাঁরা এই অনুদানের যোগ্য। যেসব প্রত্যন্ত এলাকায় ডায়ালাইসিস সেবার সুযোগ নেই, সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্রের ভিত্তিতেও সহায়তা পাওয়া যাবে।

৩. লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis)

হেপাটোলজিস্ট (Hepatologist) বা গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট (Gastroenterologist) কর্তৃক শনাক্তকৃত লিভার সিরোসিস রোগী, যাঁদের যকৃতের কার্যক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং উন্নত চিকিৎসা বা লিভার প্রতিস্থাপন প্রয়োজন, তাঁরা এই তালিকায় রয়েছেন।

৪. স্ট্রোকে প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত (Stroke & Neurological Paralysis)

মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোকজনিত কারণে সৃষ্ট প্যারালাইসিস, স্নায়বিক (Neurological / Neurodevelopmental) জটিলতা অথবা বড় কোনো দুর্ঘটনাজনিত আঘাতের কারণে শরীরের কোনো অংশ বা একাধিক অঙ্গ কর্মক্ষমতা হারিয়ে স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার হলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের (Rehabilitation) জন্য এই সহায়তা দেওয়া হয়।

৫. জন্মগত ও জটিল হৃদরোগ (Congenital & Complex Heart Disease)

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ (Cardiologist) কর্তৃক নির্ণীত শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ (যার জন্য কার্ডিয়াক সার্জারি বা ডিভাইস ক্লোজার জরুরি) এবং বয়স্কদের জটিল হৃদরোগ এই সুবিধার আওতায় পড়বে। বিশেষ করে যাঁদের হার্টের বাইপাস সার্জারি (CABG), করোনারি স্টেন্ট বা রিং পরানো, পেসমেকার (Pacemaker) সংযোজন কিংবা হার্টের ভাল্ব রিপ্লেসমেন্ট ও রিপেয়ারের মতো জটিল অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, তাঁরা আবেদন করতে পারবেন।

৬. থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia)

বংশগত রক্তের রোগ থ্যালাসেমিয়ায় (আলফা বা বেটা থ্যালাসেমিয়া মেজর) আক্রান্ত রোগী, যাঁদের শরীরে স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না এবং বেঁচে থাকার জন্য নিয়মিত রক্ত সঞ্চালন (Blood Transfusion), আয়রন চিলেশন থেরাপি বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন (Bone Marrow Transplant) প্রয়োজন—তাঁরা হেমাটোলজিস্টের প্রত্যয়ন সাপেক্ষে অনুদান পাবেন।

৭. লিউকেমিয়া বা ব্লাড ক্যান্সার (Leukemia)

রক্ত ও অস্থিমজ্জার (Bone Marrow) গুরুতর ক্যান্সার লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য ২০২৬–২৭ অর্থবছর থেকে স্বতন্ত্রভাবে এই সহায়তার সুযোগ রাখা হয়েছে। হেমাটোলজিস্ট কর্তৃক নির্ণীত লিউকেমিয়া রোগীরা কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টের খরচের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

কারা এই চিকিৎসা সহায়তা পাওয়ার যোগ্য? (Eligibility & Priority Criteria)

সরকারি এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য হলো অর্থের অভাবে যেন কোনো দরিদ্র রোগী বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ না করেন এবং চিকিৎসা করাতে গিয়ে কোনো পরিবার যেন নিঃস্ব না হয়ে পড়ে। তাই উপকারভোগী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কিছু মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়:

  • নাগরিকত্ব ও আর্থিক অবস্থা: আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে। দরিদ্র, অসচ্ছল ও নিম্ন আয়ের পরিবারের রোগীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আবেদনের সময় পরিবারের মাসিক আয়-ব্যয় ও আর্থ-সামাজিক অবস্থা যাচাই করা হয়।
  • ভূমিহীন ও নিঃস্বদের প্রাধান্য: আর্থিক অবস্থার বিচারে শিশু, নিঃস্ব, উদ্বাস্তু এবং ভূমিহীনদের ক্রমানুসারে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, বসতবাড়ি ছাড়া কোনো ব্যক্তির জমির পরিমাণ ০.৫০ একর (৫০ শতাংশ) বা তার কম হলে তিনি ভূমিহীন হিসেবে গণ্য হবেন।
  • বিশেষ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত গোষ্ঠী: সামাজিক ও মানবিক বিবেচনায় শিশু, নারী, বয়োজ্যেষ্ঠ (প্রবীণ নাগরিক), শারীরিক প্রতিবন্ধী, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন অসহায় রোগীরা বিশেষ প্রাধান্য পাবেন।
  • জরুরি জীবন ঝুঁকি: যেসব রোগীর শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন এবং দ্রুত অস্ত্রোপচার বা থেরাপি না দিলে জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়বে, বাছাই কমিটি তাঁদের তালিকায় সবার ওপরে স্থান দেয়।
  • অনুদান প্রাপ্তির সর্বোচ্চ সীমা: একজন রোগী একই অর্থবছরে কেবল ১ বার এই অনুদান নিতে পারবেন। তবে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনে একজন ব্যক্তি তাঁর পুরো জীবদ্দশায় সর্বোচ্চ ৩ বার (ভিন্ন ভিন্ন অর্থবছরে) এই সরকারি সহায়তার জন্য নির্বাচিত হতে পারবেন।

আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও রোগভেদে টেস্ট রিপোর্ট

অনলাইনে ফরম পূরণের আগেই রোগীর সকল দরকারি কাগজপত্র এবং মেডিকেল রিপোর্ট গুছিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ত্রুটিপূর্ণ বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের কারণে প্রতিবছর অসংখ্য আবেদন প্রাথমিক যাচাইয়েই বাদ পড়ে যায়।

সাধারণ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (General Documents)

  • জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মসনদ: রোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card)-এর ফটোকপি। রোগী অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশু হলে তার অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদের (Birth Registration Certificate) ফটোকপি।
  • অভিভাবক ও নমিনির তথ্য: রোগীর পক্ষে পরিবারের অন্য কেউ বা অভিভাবক আবেদন করলে সেই আবেদনকারীর এনআইডি কার্ডের ফটোকপি এবং আবশ্যিকভাবে একজন নমিনির (Nominee) বিস্তারিত তথ্য।
  • পাসপোর্ট সাইজের ছবি: রোগীর এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আবেদনকারী বা অভিভাবকের ১ কপি করে সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
  • ব্যাংক হিসাবের প্রমাণক: অনুদানের ১ লাখ টাকা সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (G2P বা চেক মারফত) প্রদান করা হয়। তাই রোগী অথবা তাঁর বৈধ অভিভাবকের নামে থাকা সচল ব্যাংক হিসাবের (Active Bank Account) তথ্য এবং ব্যাংক চেক বইয়ের কভার পাতার (Checkbook Cover Page) ফটোকপি অবশ্যই সংযুক্ত করতে হবে।
  • চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও প্রত্যয়ন: বিএমডিসি (BMDC) রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সর্বশেষ ব্যবস্থাপত্র (Prescription) এবং নির্ধারিত ফরমে চিকিৎসকের স্বাক্ষরিত প্রত্যয়নপত্র।

রোগ শনাক্তকরণে যেসব মেডিকেল টেস্ট রিপোর্ট লাগবে (Diagnostic Reports)

আবেদনপত্রের সাথে রোগ শনাক্তকরণের প্রমাণ হিসেবে অনধিক ১ (এক) বছরের পুরনো টেস্ট রিপোর্টের সত্যায়িত ফটোকপি জমা দিতে হবে। মনে রাখবেন, রিপোর্টের মূল কপি বা এক্স-রে/এমআরআই ফিল্ম জমা দেওয়ার প্রয়োজন নেই, কেবল ফটোকপি প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা দ্বারা সত্যায়িত করে দিলেই চলবে।

রোগের নাম আবশ্যিক মেডিকেল টেস্ট রিপোর্ট (সত্যায়িত ফটোকপি)
১. ক্যান্সার (Cancer) টিস্যু ডায়াগনস্টিক রিপোর্ট, বায়োপসি (Biopsy Report), হিস্টোপ্যাথলজি (Histopathology), সাইটোপ্যাথলজি (Cytopathology) অথবা বোন ম্যারো রিপোর্ট।
২. কিডনি রোগ (Kidney Disease) রক্তের ইউরিয়া (Blood Urea) ও সিরাম ক্রিয়েটিনিনের (Serum Creatinine) মাত্রা নির্ণয়ের রিপোর্ট, ডায়ালাইসিস বা প্রতিস্থাপন সংক্রান্ত রিপোর্ট এবং নিয়মিত ডায়ালাইসিস গ্রহণের প্রমাণক হিসেবে হাসপাতাল/সেবাকেন্দ্রের চিকিৎসকের সার্টিফিকেট।
৩. লিভার সিরোসিস (Liver Cirrhosis) লিভারের আল্ট্রাসনোগ্রাম (Ultrasonogram) এবং ফাইব্রোস্ক্যান (FibroScan) রিপোর্টসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য লিভার ফাংশন টেস্ট রিপোর্ট।
৪. প্যারালাইসিস (Paralysis) আক্রান্ত স্থানের এমআরআই (MRI) অথবা সিটি স্ক্যান (CT Scan) রিপোর্ট এবং রোগীর বর্তমান শারীরিক অবস্থার প্রমাণযোগ্য ছবি।
৫. হৃদরোগ (Heart Disease) এনজিওগ্রাম (Angiogram) অথবা ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram) রিপোর্টসহ অস্ত্রোপচার বা স্টেন্টিংয়ের পরামর্শসংবলিত টেস্ট রিপোর্ট।
৬. থ্যালাসেমিয়া ও লিউকেমিয়া রক্তের হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস (Hemoglobin Electrophoresis), কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট (CBC) বা বোন ম্যারো পরীক্ষার প্রযোজ্য রিপোর্ট।

অনলাইনে ও অফলাইনে আবেদনের ধাপে ধাপে নিয়ম (Step-by-Step Application Guide)

রোগী নিজে অথবা তাঁর পক্ষে পরিবারের যেকোনো সদস্য বা আইনানুগ অভিভাবক খুব সহজেই স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার করে অনলাইনে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারবেন। নিচে পুরো প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে তুলে ধরা হলো:

ধাপ ১: অনলাইন পোর্টালে ফরম পূরণ

প্রথমে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সেবা পোর্টাল (mswservices.gov.bd) অথবা সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্ধারিত অনলাইন আবেদন পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে। সেখানে ‘চিকিৎসা সহায়তা (ক্যান্সার, কিডনি রোগ, লিভার সিরোসিস, প্যারালাইসিস, হৃদরোগ, লিউকেমিয়া এবং থ্যালাসেমিয়া)’ সেবাটি নির্বাচন করে আবেদন ফরমে ক্লিক করুন। ফরমের লাল তারকা (*) চিহ্নিত ঘরগুলোতে রোগীর নাম, এনআইডি/জন্মসনদ নম্বর, ঠিকানা, রোগের ধরন, ব্যাংক হিসাবের তথ্য ও মোবাইল নম্বর নির্ভুলভাবে পূরণ করুন।

ধাপ ২: আবেদন সংরক্ষণ ও চূড়ান্ত দাখিল (Submit)

ফরম পূরণের সময় সব তথ্য ভালোভাবে মিলিয়ে নিন। চূড়ান্তভাবে সাবমিট করার আগে প্রয়োজনে আবেদনটি ড্রাফট হিসেবে সংরক্ষণ ও সংশোধন করা যায়। সব তথ্য সঠিক থাকলে ‘আবেদন দপ্তরে দাখিল করুন’ বাটনে ক্লিক করে চূড়ান্তভাবে সাবমিট করুন। আবেদন সফলভাবে দাখিল হলে আপনার নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে SMS-এর মাধ্যমে একটি আবেদন নম্বর (Application ID) এবং ট্র্যাকিং নম্বর (Tracking Number) পাঠানো হবে। এই নম্বরটি যত্ন করে সংরক্ষণ করুন।

ধাপ ৩: প্রিন্ট ও কাগজপত্র সত্যায়ন

অনলাইনে আবেদন দাখিলের পর পূরণকৃত ফরমটি ডাউনলোড করে প্রিন্ট করে নিন। প্রিন্ট করা আবেদনপত্রের নির্ধারিত স্থানে আবেদনকারীর স্বাক্ষর দিন। এরপর ১ম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা (যেমন সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক, সরকারি কলেজের শিক্ষক বা বিসিএস কর্মকর্তা) দ্বারা রোগীর এনআইডি/জন্মসনদ, সর্বশেষ প্রেসক্রিপশন এবং মেডিকেল টেস্ট রিপোর্টের ফটোকপিগুলো সত্যায়িত করে নিন।

ধাপ ৪: সমাজসেবা কার্যালয়ে হার্ডকপি জমাদান (অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ)

অনেকেই কেবল অনলাইনে ফরম পূরণ করেই কাজ শেষ মনে করেন—যা একটি বড় ভুল। অনলাইনে আবেদনের পর স্বাক্ষরিত প্রিন্ট কপি, চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র এবং সত্যায়িত সকল কাগজপত্রের ২ (দুই) সেট ফাইল প্রস্তুত করতে হবে। এরপর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপনার নিজ এলাকার উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়, শহর সমাজসেবা কার্যালয় অথবা সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয়ে সরাসরি উপস্থিত হয়ে ফাইলটি জমা দিতে হবে। হার্ডকপি অফিসে জমা না দিলে আপনার অনলাইন আবেদনটি পরবর্তী যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিবেচিত হবে না।

প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া ও অনুদানের টাকা পাওয়ার সময়সীমা

উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদনপত্র জমা দেওয়ার পর সেগুলো জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। উপপরিচালক প্রাপ্ত আবেদনের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে যোগ্য ও অযোগ্য প্রার্থীদের দুটি পৃথক তালিকা তৈরি করে জেলা বাস্তবায়ন কমিটির সভায় উপস্থাপন করেন।

জেলা বাস্তবায়ন কমিটি রোগীর শারীরিক অবস্থার গুরুত্ব, কাগজপত্রের সত্যতা এবং পারিবারিক আর্থিক অবস্থা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা অনুমোদন করে। সিটিজেন চার্টার অনুযায়ী, সব প্রক্রিয়া ও বরাদ্দ স্বাভাবিক থাকলে যাচাই-বাছাই শেষে সাধারণত ২১ থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নির্বাচিত রোগীর ব্যাংক হিসাব বা চেকের মাধ্যমে এককালীন ১ লাখ টাকা হস্তান্তর করা হয়। আবেদনকারী তাঁর মোবাইল নম্বর ও ট্র্যাকিং নম্বর ব্যবহার করে অনলাইনেই আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা (Application Tracking) যাচাই করতে পারবেন।

প্রতারক চক্র থেকে সতর্কতা ও জরুরি পরামর্শ

সরকারি এই চিকিৎসা অনুদান নিয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করেছে। এই কর্মসূচিতে আবেদনের জন্য সরকার নির্ধারিত কোনো ফি নেই। অথচ অনেক সময় অসাধু দালাল বা প্রতারক চক্র সাধারণ রোগী ও তাঁদের স্বজনদের কাছে দ্রুত অনুদান পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিকাশ, নগদ বা নগদ অর্থের বিনিময়ে লেনদেনের প্রস্তাব দেয়।

মনে রাখবেন:

  • অনুদান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা চক্রকে কোনো ধরনের টাকা-পয়সা দেবেন না।
  • ভুল তথ্য প্রদান করলে বা জাল মেডিকেল রিপোর্ট দাখিল করলে আবেদন তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে।
  • ফরম পূরণের আগে আপনার স্থানীয় উপজেলা বা শহর সমাজসেবা কার্যালয় কিংবা বড় সরকারি হাসপাতালের ‘হাসপাতাল সমাজসেবা অফিসারের’ কক্ষে যোগাযোগ করে সর্বশেষ নির্দেশনা জেনে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
  • অনলাইন আবেদনে কারিগরি কোনো সমস্যা হলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সফটওয়্যার হেল্পলাইন নম্বরে (01814233642, সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা) যোগাযোগ করতে পারেন।

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ - AEO & Quick Answers)

১. ক্যান্সার ও কিডনিসহ ৭টি জটিল রোগে সরকারি সহায়তা কত টাকা দেওয়া হয়?

২০২৬–২০২৭ অর্থবছর থেকে নির্বাচিত প্রত্যেক রোগীকে এককালীন ১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা করে সরকারি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে, যা আগে ৫০ হাজার টাকা ছিল।

২. একজন রোগী সর্বোচ্চ কতবার এই সরকারি অনুদান পেতে পারেন?

একজন রোগী একই অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১ বার এবং তাঁর পুরো জীবদ্দশায় সর্বোচ্চ ৩ বার এই চিকিৎসা সহায়তা পেতে পারেন।

৩. শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক রোগীর কি এনআইডি কার্ড লাগবে?

না, অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশু রোগীদের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) পরিবর্তে অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদের সত্যায়িত ফটোকপি এবং বাবা-মা বা বৈধ অভিভাবকের এনআইডি ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য দিয়ে আবেদন করা যাবে।

৪. শুধুমাত্র অনলাইনে আবেদন করলেই কি টাকা পাওয়া যাবে?

না। অনলাইনে আবেদন সাবমিট করার পর তার প্রিন্ট কপি এবং প্রয়োজনীয় সকল মেডিকেল রিপোর্ট ও কাগজপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি (২ সেট) অবশ্যই সংশ্লিষ্ট উপজেলা, শহর বা হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয়ে সরাসরি জমা দিতে হবে।

শেষ কথা

ক্যান্সার, কিডনি বিকল, লিভার সিরোসিস বা হৃদরোগের মতো জটিল ব্যাধি শুধু একজন মানুষকে শারীরিকভাবেই কাবু করে না, বরং পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। এমন কঠিন সময়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের এককালীন ১ লাখ টাকার এই সরকারি অনুদান একটি অসচ্ছল পরিবারের জন্য বড় ধরনের স্বস্তি ও আশার আলো হয়ে উঠতে পারে। আপনার পরিচিত কোনো দরিদ্র প্রতিবেশী, আত্মীয় বা সহপাঠীর পরিবারে যদি এমন কোনো জটিল রোগী থাকেন, তবে আজই তাঁদের এই সরকারি সুবিধার কথা জানান এবং সঠিকভাবে আবেদন করতে সহায়তা করুন। আপনার একটি ছোট্ট তথ্য ও সহযোগিতায় হয়তো বেঁচে যেতে পারে একটি অসহায় মানুষের প্রাণ।

Shakil Author

Shakil

হ্যালো "ট্রিকবিডি" বাসী আমি শাকিল আহাম্মেদ। দীর্ঘদিন থেকে অনলাইনে লেখালেখির পেশায় যুক্ত আছি। TrickBD আমার নিজের হাতে তৈরি করা একটি ওয়েবসাইট। এখানে আমি প্রতিনিয়ত ব্লগিং, ইউটিউবিং ও প্রযুক্তি সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ টিপস এন্ড ট্রিক্স রিলেটেড আর্টিকেল প্রকাশ করে থাকি।