নতুন বাজেটে প্রতিবন্ধী ভাতা ২০২৫–২৬: মাসে কত টাকা পাবেন?

২০২৫-২৬ বাজেটে প্রতিবন্ধী ভাতা ৯০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জানুন কীভাবে আবেদন করবেন, কারা পাবেন এবং কখন পেমেন্ট দেয়া হয়। সম্পূর্ণ গাইড পড়ুন।

Feb 17, 2026 - 09:37
 0  12
নতুন বাজেটে প্রতিবন্ধী ভাতা ২০২৫–২৬: মাসে কত টাকা পাবেন?

বাংলাদেশ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ হলো প্রতিবন্ধী ভাতা (Disability Allowance)। প্রতিবছর বাজেট ঘোষণার সময় দেশের লাখো প্রতিবন্ধী নাগরিক এবং তাদের পরিবার জানতে উৎসুক থাকেন যে নতুন বাজেটে কী পরিমাণ ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের নতুন বাজেটে প্রতিবন্ধী ভাতা সংক্রান্ত সকল তথ্য আজকের এই আর্টিকেলে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।

এই আর্টিকেলে আপনি জানতে পারবেন মাসিক ভাতার পরিমাণ, আগের বছরের তুলনায় কতটা বৃদ্ধি হয়েছে, কারা এই ভাতা পাওয়ার যোগ্য, কীভাবে অনলাইনে আবেদন করবেন এবং কখন পেমেন্ট পাবেন। চলুন শুরু করা যাক।

প্রতিবন্ধী ভাতা কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

প্রতিবন্ধী ভাতা হচ্ছে বাংলাদেশ সরকারের একটি নিয়মিত আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি যা দেশের অসচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত প্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য বিশেষভাবে প্রদান করা হয়। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মৌলিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করা এবং তাদের দৈনন্দিন খরচ, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে সহায়তা করা।

বাংলাদেশে প্রায় ১৭ লাখের বেশি প্রতিবন্ধী মানুষ রয়েছে যারা শারীরিক, মানসিক, দৃষ্টি, শ্রবণ বা অন্যান্য ধরনের প্রতিবন্ধকতায় ভুগছেন। তাদের অনেকেই নিজে উপার্জন করতে পারেন না এবং পরিবারের উপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের এই মাসিক ভাতা তাদের জীবনে বড় ধরনের স্বস্তি এনে দেয়।

২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রতিবন্ধী ভাতা মাসে কত টাকা?

২০২৫–২৬ অর্থবছরের নতুন বাজেটে প্রতিবন্ধী ভাতার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে মাসিক ৯০০ টাকা। এর আগে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এই ভাতার পরিমাণ ছিল ৮৫০ টাকা। অর্থাৎ নতুন বাজেটে ৫০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। যদিও এই বৃদ্ধির পরিমাণ খুব বেশি নয়, তবুও মূল্যস্ফীতির এই যুগে প্রতিটি টাকাই গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া নতুন বাজেটে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করে প্রায় ৩৪.৫০ লাখ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় অনেক বেশি। এর ফলে আরও অনেক অসচ্ছল প্রতিবন্ধী মানুষ এই সরকারি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।

প্রতিবন্ধী ভাতার তুলনামূলক তথ্য (২০২৪-২৫ vs ২০২৫-২৬)

বিবরণ ২০২৪–২৫ অর্থবছর ২০২৫–২৬ অর্থবছর বৃদ্ধি
মাসিক ভাতার পরিমাণ ৮৫০ টাকা ৯০০ টাকা ৫০ টাকা
উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ প্রায় ৩৪.৫০ লাখ ২.৫০ লাখ
পেমেন্ট পদ্ধতি ব্যাংক/মোবাইল ব্যাংকিং ব্যাংক/মোবাইল ব্যাংকিং একই

কারা প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার যোগ্য?

প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও শর্ত পূরণ করতে হয়। সরকার শুধুমাত্র সেই সব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতা প্রদান করে যারা আর্থিকভাবে দুর্বল এবং অন্য কোনো নিয়মিত আয়ের উৎস নেই। চলুন জেনে নিই কারা এই ভাতা পাওয়ার যোগ্য।

প্রতিবন্ধী ভাতার যোগ্যতার শর্তসমূহ:

আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের স্থায়ী নাগরিক হতে হবে এবং তার কাছে বৈধ জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন সনদ থাকতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবেদনকারীর কাছে সরকার স্বীকৃত প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র বা সুবর্ণ কার্ড (Golden Card) থাকতে হবে। এই কার্ড সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ইস্যু করা হয় এবং এটি ছাড়া ভাতা পাওয়া সম্ভব নয়।

আবেদনকারীর পরিবার অবশ্যই আর্থিকভাবে অসচ্ছল হতে হবে এবং নির্ধারিত আয়সীমার মধ্যে থাকতে হবে। যদি পরিবারে উপার্জনক্ষম সদস্য থাকে এবং তারা নিয়মিত আয় করেন, তাহলে সেই পরিবারের সদস্য ভাতা পাওয়ার যোগ্য নাও হতে পারেন। এছাড়া যারা ইতিমধ্যে অন্য কোনো সরকারি ভাতা (যেমন বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা) নিয়মিত পাচ্ছেন, তারা সাধারণত প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার যোগ্য নন।

বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয় গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের, যাদের শারীরিক অবস্থা খুবই খারাপ এবং যারা সম্পূর্ণভাবে অন্যের উপর নির্ভরশীল। এছাড়া যেসব পরিবারে কোনো উপার্জনক্ষম সদস্য নেই, তাদেরও অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।

প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য কীভাবে আবেদন করবেন?

প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার জন্য আপনাকে সঠিকভাবে আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। বর্তমানে দুইটি উপায়ে আবেদন করা যায়: অনলাইনে এবং সরাসরি অফিসে গিয়ে। চলুন দুইটি পদ্ধতি বিস্তারিত জেনে নিই।

অনলাইনে আবেদনের নিয়ম (Online Application Process)

অনলাইনে আবেদন করতে প্রথমে আপনাকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করতে হবে। ওয়েবসাইটে প্রবেশ করার পর প্রতিবন্ধী ভাতা আবেদন সেকশনে যেতে হবে এবং সেখানে অনলাইন আবেদন ফরম পাওয়া যাবে। ফরমটি সাবধানে এবং সঠিক তথ্য দিয়ে পূরণ করতে হবে।

ফরম পূরণের সময় আপনার ব্যক্তিগত তথ্য (নাম, জন্মতারিখ, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর), ঠিকানা, প্রতিবন্ধিতার ধরন, সুবর্ণ কার্ড নম্বর এবং পরিবারের আয় সংক্রান্ত তথ্য দিতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট যেমন সুবর্ণ কার্ডের কপি, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি ইত্যাদি আপলোড করতে হবে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সাবমিট বাটনে ক্লিক করুন।

আবেদন সাবমিট করার পর আপনার আবেদনটি যাচাই প্রক্রিয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসে পাঠানো হবে। সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আবেদন যাচাই করা হয় এবং অনুমোদিত হলে আপনি মোবাইল নম্বরে SMS এর মাধ্যমে জানতে পারবেন।

সরাসরি অফিসে গিয়ে আবেদনের নিয়ম (Offline Application Process)

যারা অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন না বা স্মার্টফোন/ইন্টারনেট সুবিধা নেই, তারা সরাসরি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা অথবা উপজেলা সমাজসেবা অফিসে গিয়ে আবেদন করতে পারবেন। সেখানে গিয়ে প্রথমে আবেদন ফরম সংগ্রহ করতে হবে এবং সেটি সঠিকভাবে পূরণ করতে হবে।

ফরম পূরণের সময় সকল তথ্য স্পষ্টভাবে লিখতে হবে এবং কোনো ভুল তথ্য দেওয়া যাবে না। এরপর নিচের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রগুলো ফরমের সাথে সংযুক্ত করতে হবে এবং অফিসে জমা দিতে হবে। অফিস থেকে একটি রসিদ দেওয়া হবে যা সংরক্ষণ করে রাখতে হবে।

প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র (Required Documents)

ক্রমিক ডকুমেন্টের নাম বিবরণ
সুবর্ণ কার্ড (Subarno Card) সরকার স্বীকৃত প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্রের ফটোকপি
জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধন NID বা Birth Certificate এর কপি
পাসপোর্ট সাইজ ছবি সাম্প্রতিক ২-৩ কপি রঙিন ছবি
আয় সংক্রান্ত তথ্য পরিবারের মাসিক আয়ের প্রমাণপত্র (ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভা থেকে)
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তথ্য মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর অথবা ব্যাংক হিসাব নম্বর

প্রতিবন্ধী ভাতা কখন এবং কীভাবে দেওয়া হয়?

অনেকেই জানতে চান প্রতিবন্ধী ভাতা কখন পাওয়া যায় এবং কোন মাধ্যমে টাকা দেওয়া হয়। সাধারণত এই ভাতা প্রতি মাসে আলাদাভাবে না দিয়ে প্রতি তিন মাসে একবার একসাথে প্রদান করা হয়। অর্থাৎ তিন মাসের ভাতা একবারে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে জমা হয়।

উদাহরণস্বরূপ, যদি মাসিক ভাতা ৯০০ টাকা হয়, তাহলে তিন মাসে মোট ২৭০০ টাকা একবারে পেমেন্ট করা হবে। এই টাকা সাধারণত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (যেমন বিকাশ, নগদ, রকেট) বা পোস্ট অফিসের মাধ্যমে বিতরণ করা হয়।

তবে কখনো কখনো প্রশাসনিক কারণে পেমেন্ট কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। তাই নিয়মিত আপনার মোবাইল নম্বর এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট চেক করতে থাকুন। এছাড়া স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা সমাজসেবা অফিস থেকেও তথ্য জানতে পারবেন।

প্রতিবন্ধী ভাতা নিয়ে প্রায়শ জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)

১. ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রতিবন্ধী ভাতা মাসে কত টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে?

নতুন বাজেট অনুযায়ী মাসিক ৯০০ টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫০ টাকা বেশি।

২. প্রতিবন্ধী ভাতা কত মাস পরপর দেওয়া হয়?

সাধারণত প্রতি তিন মাসে একবার একসাথে তিন মাসের ভাতা প্রদান করা হয়। অর্থাৎ একবারে ২৭০০ টাকা (৯০০×৩) পাবেন।

৩. সুবর্ণ কার্ড ছাড়া কি প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়া সম্ভব?

না। সরকার স্বীকৃত প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্র বা সুবর্ণ কার্ড থাকা বাধ্যতামূলক। এই কার্ড ছাড়া ভাতার জন্য আবেদন করা যায় না।

৪. অনলাইনে আবেদন করা কি বাধ্যতামূলক?

না, অনলাইনে আবেদন বাধ্যতামূলক নয়। আপনি চাইলে সরাসরি ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলা সমাজসেবা অফিসে গিয়েও আবেদন করতে পারবেন।

৫. একই ব্যক্তি কি একাধিক সরকারি ভাতা একসাথে নিতে পারবেন?

সাধারণত একই ধরনের একাধিক সরকারি ভাতা একসাথে গ্রহণ করা যায় না। যদি কেউ ইতিমধ্যে বয়স্ক ভাতা বা বিধবা ভাতা পান, তাহলে প্রতিবন্ধী ভাতা পাওয়ার যোগ্য নাও হতে পারেন।

৬. সুবর্ণ কার্ড কীভাবে পাবো?

সুবর্ণ কার্ড পেতে হলে আপনাকে উপজেলা সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। সেখানে প্রতিবন্ধিতার মেডিকেল সার্টিফিকেট জমা দিয়ে আবেদন করতে হবে এবং যাচাই-বাছাই শেষে কার্ড ইস্যু করা হবে।

৭. প্রতিবন্ধী ভাতা পেতে কতদিন সময় লাগে?

আবেদন করার পর সাধারণত ২ থেকে ৬ মাসের মধ্যে ভাতা পাওয়া শুরু হয়। তবে এটি নির্ভর করে আবেদনের যাচাই প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক কাজের উপর।

৮. ভাতার টাকা কীভাবে তুলবো?

ভাতার টাকা আপনার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট (বিকাশ, নগদ, রকেট) অথবা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি জমা হবে। আপনি এজেন্ট বা ATM থেকে টাকা তুলতে পারবেন।

উপসংহার: প্রতিবন্ধী ভাতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা

নতুন বাজেটে প্রতিবন্ধী ভাতা ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মাসিক ৯০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং উপকারভোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়েছে প্রায় ৩৪.৫০ লাখ। যদিও ভাতার পরিমাণ সীমিত, তবুও দেশের লাখো অসচ্ছল প্রতিবন্ধী নাগরিক এবং তাদের পরিবারের জন্য এটি একটি বড় সহায়তা।

যারা এখনো এই ভাতার জন্য আবেদন করেননি এবং যোগ্য, তারা দ্রুত অনলাইন বা অফলাইনে আবেদন করুন। সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করলে এবং সকল ডকুমেন্ট ঠিকমতো জমা দিলে ভাতা পাওয়া সহজ হবে। মনে রাখবেন, এই ভাতা আপনার অধিকার এবং সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি প্রকাশ।

আশা করি এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য তথ্যবহুল এবং সহায়ক হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা সংক্রান্ত আরও কোনো প্রশ্ন থাকলে স্থানীয় সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করুন অথবা অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।

Shakil Hi, i am shakil