ঢাকায় নতুন মেট্রোরেল লাইনে কিমি প্রতি ব্যয় দ্বিগুণের বেশি: যা জানা জরুরি
রাজধানী ঢাকার যানজট সমস্যা সমাধানে মেট্রোরেল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চালু হওয়া MRT Line-6 ইতিমধ্যে যাত্রীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু নতুন দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, নতুন মেট্রোরেল লাইনে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় পূর্ববর্তী লাইনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হতে যাচ্ছে, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের বর্তমান পরিস্থিতি কী?
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বর্তমানে চালু রয়েছে MRT Line-6, যা উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২১.২৬ কিলোমিটার পথ জুড়ে বিস্তৃত। এই লাইনটি নির্মাণে মোট ব্যয় হয়েছে ৩৩,৪৭২ কোটি টাকা, যার অর্থ প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়েছে প্রায় ১,৫৭৪ কোটি টাকা। এটি জাপানের সহযোগী সংস্থা JICA (Japan International Cooperation Agency) এর অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে এবং ২০২২ সাল থেকে আংশিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরু করেছে।
কিন্তু এখন যে দুটি নতুন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা চলছে—MRT Line-1 এবং MRT Line-5 (North)—সেগুলোর খরচ অনেক বেশি হতে যাচ্ছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুটি লাইনে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৩,৬১৮ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী লাইনের তুলনায় ২.৩ গুণ বেশি।
নতুন দুই মেট্রোরেল লাইনের পরিচিতি
MRT Line-1 এবং MRT Line-5 (North) হলো ঢাকা শহরের গণপরিবহন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের অংশ। এই দুটি প্রকল্প রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে সংযুক্ত করবে এবং প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াত সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
MRT Line-1: কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর এবং পূর্বাচল
MRT Line-1 প্রকল্পটি কমলাপুর থেকে শুরু হয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এই লাইনের মোট দৈর্ঘ্য হবে ৩১ কিলোমিটারের বেশি। এতে থাকবে উড়ালপথ (Elevated) এবং পাতালপথ (Underground) উভয় ধরনের অংশ। এই প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে অনুমোদন পায় এবং প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫২,৫৬১ কোটি টাকা।
কিন্তু দরপত্র বিশ্লেষণের পর দেখা গেছে, এই প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ৯৬,৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক বছরে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
MRT Line-5 (North): হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা
MRT Line-5 (North) প্রকল্পটি সাভারের হেমায়েতপুর থেকে শুরু হয়ে মিরপুর ও গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত যাবে। এই লাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ কিলোমিটার। ২০১৯ সালের অক্টোবরে অনুমোদিত এই প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৪১,২৩৮ কোটি টাকা। কিন্তু ঠিকাদারদের প্রস্তাবিত দর অনুযায়ী এখন এর ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৮৮,০০০ কোটি টাকা।
এই দুটি লাইন মিলিয়ে মোট ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের বৃহত্তম অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটি।
মেট্রোরেল খরচ তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| প্রকল্পের নাম | দৈর্ঘ্য (কিমি) | মোট ব্যয় (কোটি টাকা) | প্রতি কিমি ব্যয় (কোটি টাকা) | অনুমোদনের বছর |
|---|---|---|---|---|
| MRT Line-6 (উত্তরা-মতিঝিল) | ২১.২৬ | ৩৩,৪৭২ | ১,৫৭৪ | ২০১৫ |
| MRT Line-1 (কমলাপুর-পূর্বাচল) | ৩১+ | ৯৬,৫০০ (প্রাক্কলিত) | ৩,১১৩ | ২০১৯ |
| MRT Line-5 North (হেমায়েতপুর-ভাটারা) | ২০ | ৮৮,০০০ (প্রাক্কলিত) | ৪,৪০০ | ২০১৯ |
ব্যয় বৃদ্ধির মূল কারণগুলো কী?
নতুন মেট্রোরেল প্রকল্পগুলোতে ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে, যা বিশেষজ্ঞ এবং Dhaka Mass Transit Company Limited (DMTCL) এর কর্মকর্তারা চিহ্নিত করেছেন।
১. সীমিত প্রতিযোগিতা ও JICA শর্ত
দুটি প্রকল্পেই অর্থায়ন করছে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা JICA। JICA এর ঋণের শর্ত অনুযায়ী, জাপানি ঠিকাদারদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এর ফলে দরপত্রে প্রতিযোগিতা সীমিত হয়ে পড়েছে। যখন কম সংখ্যক ঠিকাদার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দাম বেশি থাকে।
DMTCL এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক আহমেদ জানিয়েছেন যে, প্রকৌশলগত বিভিন্ন শর্তের কারণেও দরপত্রে প্রতিযোগিতা কমে গেছে। তিনি বলেন, "প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারলে ব্যয় কমানো সম্ভব হবে।"
২. আন্ডারগ্রাউন্ড বা পাতালপথ নির্মাণ
নতুন দুটি প্রকল্পের একটি বড় অংশ পাতালপথে (Underground) নির্মিত হবে। পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণ অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল। এতে Tunnel Boring Machine (TBM) ব্যবহার করতে হয়, মাটির নিচে শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক বেশি জোরদার করতে হয়। উড়ালপথের তুলনায় পাতালপথ নির্মাণে খরচ প্রায় ৩-৪ গুণ বেশি হতে পারে।
৩. নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি
আন্তর্জাতিক বাজারে ইস্পাত, সিমেন্ট এবং অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত কোভিড-১৯ মহামারীর পর এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে global supply chain ব্যাহত হওয়ায় নির্মাণ খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
৪. জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন
ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে জমি অধিগ্রহণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জমির দাম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পুনর্বাসনের জন্যও বিপুল অর্থ ব্যয় হয়।
৫. প্রযুক্তিগত জটিলতা
নতুন লাইনগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তি এবং automation system ব্যবহার করা হচ্ছে, যা বেশি ব্যয়বহুল কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ ও দক্ষ।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা
বাংলাদেশে মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যয় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় বেশি বলে মনে করা হচ্ছে। ভারতের Patna Cityতে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে মাত্র ৪০.৭৭ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা)। অপরদিকে, ঢাকায় এই খরচ ২২৬-২৫৪ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২,০০০-২,২০০ কোটি টাকা) প্রতি কিলোমিটার, যা ভারতের তুলনায় প্রায় ৫ গুণ বেশি।
| দেশ/শহর | প্রকল্প | প্রতি কিমি খরচ (মিলিয়ন USD) |
|---|---|---|
| ভারত (Patna) | Metro Rail | ৪০.৭৭ |
| বাংলাদেশ (ঢাকা Line-6) | MRT Line-6 | ১৩৫-১৫০ |
| বাংলাদেশ (নতুন লাইন) | MRT Line-1 & 5 | ২২৬-২৫৪ |
যাত্রীদের ওপর প্রভাব: ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা
এত বিপুল ব্যয়ে মেট্রোরেল নির্মাণ করা হলে সেই খরচ উঠাতে যাত্রী ভাড়া বাড়ানো হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। বর্তমানে MRT Line-6 এ সর্বোচ্চ ভাড়া ১০০ টাকা, যা সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী। কিন্তু যদি নতুন লাইনগুলোর জন্য ভাড়া ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়, তাহলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ এটি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত হতে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, গণপরিবহনের উদ্দেশ্যই হলো সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা। যদি ভাড়া বেশি হয়, তাহলে মানুষ আবার বাস বা অন্যান্য বাহন ব্যবহার করবে, এবং মেট্রোরেলের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
সরকারের ঋণের বোঝা বৃদ্ধি
প্রায় ১.৮৪ লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের এই দুটি প্রকল্প সরকারের বৈদেশিক ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে। JICA থেকে নেওয়া ঋণ নরম শর্তে (Soft Loan) হলেও, দীর্ঘমেয়াদে সুদসহ এই অর্থ পরিশোধ করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ইতিমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। নতুন মেগা প্রকল্পগুলো এই বোঝা আরও বাড়াবে। তাই অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—এত ব্যয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কতটা যুক্তিসংগত?
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ কী?
বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার এই দুটি প্রকল্প নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। MRT Line-1 এর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে, এবং MRT Line-5 (North) এর মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ঠিকাদার নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি।
নির্বাচিত নতুন সরকারের ওপর এখন প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দায়িত্ব বর্তেছে। সরকার হয়তো প্রকল্পের ব্যয় পুনর্বিবেচনা করবে, অথবা বিকল্প অর্থায়নের উৎস খুঁজবে। কিছু বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দিচ্ছেন যে, Public-Private Partnership (PPP) মডেল ব্যবহার করে ব্যয় কমানো যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ এবং নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, মেট্রোরেল ঢাকার যানজট সমাধানে একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান। কিন্তু ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। Bangladesh University of Engineering and Technology (BUET) এর অধ্যাপকরা মনে করেন যে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ বাড়ালে ব্যয় কমানো সম্ভব।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, অপারেশনাল দক্ষতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ খরচও বিবেচনা করতে হবে। যদি মেট্রোরেল দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক না হয়, তাহলে এটি সরকারের জন্য একটি আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।
মেট্রোরেল প্রকল্পের সুবিধা
ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা থাকলেও, মেট্রোরেল প্রকল্পের অনেক দীর্ঘমেয়াদী সুবিধা রয়েছে:
১. যানজট কমবে: ঢাকা শহরে প্রতিদিন যানজটে হাজার হাজার কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। মেট্রোরেল চালু হলে যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
২. পরিবেশ রক্ষা: মেট্রোরেল বিদ্যুৎচালিত, তাই এটি পরিবেশবান্ধব। গাড়ির সংখ্যা কমলে বায়ু দূষণ এবং carbon emission কমবে।
৩. নিরাপদ যাতায়াত: রাস্তায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি নেই। মেট্রোরেলে যাত্রীরা নিরাপদে এবং সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে।
৪. অর্থনৈতিক উন্নয়ন: মেট্রোরেল স্টেশনের আশপাশে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
৫. শহরের আধুনিকায়ন: মেট্রোরেল ঢাকাকে একটি আধুনিক মেগাসিটিতে পরিণত করবে এবং আন্তর্জাতিক মানের পরিবহন ব্যবস্থা প্রদান করবে।
চ্যালেঞ্জ এবং করণীয়
মেট্রোরেল প্রকল্প সফল করতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে হবে:
১. প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র: দরপত্র প্রক্রিয়ায় বেশি সংখ্যক ঠিকাদারকে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে। শুধু জাপানি কোম্পানি নয়, অন্যান্য দেশের দক্ষ ঠিকাদারদেরও সুযোগ দিলে খরচ কমতে পারে।
২. স্থানীয় প্রযুক্তি ব্যবহার: যেখানে সম্ভব, স্থানীয় প্রযুক্তি এবং নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করলে ব্যয় কমবে এবং দেশীয় শিল্প শক্তিশালী হবে।
৩. স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা: প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে এবং নিয়মিত audit করতে হবে।
৪. জনসচেতনতা: মানুষকে মেট্রোরেল ব্যবহারে উৎসাহিত করতে হবে এবং এর সুবিধা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।
৫. রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা: দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা করতে হবে যাতে মেট্রোরেল সবসময় সুচারুভাবে কাজ করে।
সংক্ষিপ্ত বিবরণ (Meta Description)
ঢাকায় নতুন মেট্রোরেল লাইন নির্মাণে কিলোমিটার প্রতি ব্যয় ৩,৬১৮ কোটি টাকা—পূর্ববর্তী লাইনের দ্বিগুণ! জানুন MRT Line-1 ও Line-5 প্রকল্পের সম্পূর্ণ বিবরণ, ব্যয় বৃদ্ধির কারণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. ঢাকায় নতুন মেট্রোরেল লাইনে কিলোমিটার প্রতি খরচ কত?
নতুন দুই মেট্রোরেল লাইন—MRT Line-1 এবং MRT Line-5 (North)—এ প্রতি কিলোমিটারে খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৩,৬১৮ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী উত্তরা-মতিঝিল লাইনের (প্রতি কিমি ১,৫৭৪ কোটি টাকা) তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
২. MRT Line-1 এর মোট দৈর্ঘ্য কত এবং কোথায় যাবে?
MRT Line-1 এর দৈর্ঘ্য হবে ৩১ কিলোমিটারের বেশি। এটি কমলাপুর থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। এতে থাকবে উড়ালপথ ও পাতালপথ উভয় অংশ।
৩. নতুন মেট্রোরেল লাইনের ব্যয় কেন এত বেশি?
ব্যয় বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো হলো: দরপত্রে সীমিত প্রতিযোগিতা (JICA শর্ত অনুযায়ী জাপানি ঠিকাদারদের অগ্রাধিকার), পাতালপথ নির্মাণ (যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল), নির্মাণ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, জমি অধিগ্রহণ খরচ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার।
৪. মেট্রোরেলের ভাড়া কি বেড়ে যাবে?
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, এত বিপুল ব্যয়ের কারণে যাত্রী ভাড়া বাড়ানো হতে পারে। বর্তমানে MRT Line-6 এ সর্বোচ্চ ভাড়া ১০০ টাকা, কিন্তু নতুন লাইনে এটি ১৫০-২০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে, যা সাধারণ মানুষের জন্য বোঝা হতে পারে।
৫. MRT Line-5 (North) কখন চালু হবে?
MRT Line-5 (North) প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তবে এখনও পর্যন্ত ঠিকাদার নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি, তাই কাজ শুরু হতে এবং চালু হতে আরও বেশ কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নির্বাচিত সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর।
৬. ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে মেট্রোরেল নির্মাণ কেন বেশি ব্যয়বহুল?
ভারতের Patna Cityতে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে খরচ মাত্র ৪০.৭৭ মিলিয়ন ডলার, কিন্তু ঢাকায় এটি ২২৬-২৫৪ মিলিয়ন ডলার—প্রায় ৫ গুণ বেশি। এর কারণ হলো: সীমিত প্রতিযোগিতা, বিদেশি ঠিকাদার নির্ভরতা, ঢাকার ভূগর্ভস্থ জটিলতা, এবং উচ্চ জমির দাম।
৭. মেট্রোরেল প্রকল্পের অর্থায়ন কোথা থেকে আসছে?
উভয় প্রকল্পে অর্থায়ন করছে জাপানের JICA (Japan International Cooperation Agency)। এটি নরম শর্তে ঋণ (Soft Loan) দিচ্ছে, তবে দীর্ঘমেয়াদে সুদসহ এই বিপুল অর্থ পরিশোধ করা বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে।
৮. মেট্রোরেল কি ঢাকার যানজট সমস্যা সমাধান করতে পারবে?
হ্যাঁ, যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী সব মেট্রোরেল লাইন চালু হয়, তাহলে ঢাকার যানজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। মেট্রোরেল দ্রুত, নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থা প্রদান করবে, যা প্রতিদিন লাখো মানুষের সুবিধার জন্য কাজ করবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সঠিক বাস্তবায়ন এবং জনগণের সক্রিয় ব্যবহার।
উপসংহার
ঢাকায় নতুন মেট্রোরেল লাইন নির্মাণ একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প যা রাজধানীর পরিবহন ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে পারে। কিন্তু প্রতি কিলোমিটারে ৩,৬১৮ কোটি টাকা ব্যয়—যা পূর্ববর্তী লাইনের দ্বিগুণেরও বেশি—এই প্রকল্পকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ করলে এই খরচ কমানো সম্ভব।
নির্বাচিত সরকারের ওপর এখন দায়িত্ব পড়েছে এই প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার। সঠিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে, MRT Line-1 এবং MRT Line-5 (North) ঢাকাবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে এবং শহরকে একটি আধুনিক মেগাসিটিতে পরিণত করবে। কিন্তু যদি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হওয়া হয়, তাহলে এটি দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
সবশেষে, মেট্রোরেল শুধু একটি পরিবহন ব্যবস্থা নয়—এটি একটি জাতীয় সম্পদ যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই ঢাকা নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই সকল স্টেকহোল্ডারদের একসাথে কাজ করে এই প্রকল্প সফল করা অত্যন্ত জরুরি।